জন্তর মন্তর প্রতিবাদ নিয়ে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কেবল দাবির নয়, রাষ্ট্রের আচরণেরও। ১০ অক্টোবর CJP (Cockroach Janta Party) প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ ও SIR প্রত্যাহারের দাবিতে জন্তর মন্তরে জমায়েতের ডাক দিয়েছিল। মে মাসে অভিজিৎ দিপকের শুরু করা এই সংগঠন আজ দেশের তরুণ প্রতিবাদের অন্যতম মুখ। তার দাবির সঙ্গে সবাই একমত হবেন না, হওয়ার প্রয়োজনও নেই। কিন্তু দাবি যা-ই হোক, তার জবাবে রাষ্ট্র কীভাবে আচরণ করল, সেটা সব নাগরিকের সমান উদ্বেগের বিষয়।
সেদিন দিল্লি পুলিশ কয়েক হাজার প্রতিবাদীকে আটক করে। সুপ্রিম কোর্টের কাছ থেকে মিছিল করে রওনা দেওয়া একাধিক আইনজীবীও আটক হন। আটকের সংখ্যার কোনও সরকারি হিসাব এখনও মেলেনি। আদালতে আবেদনকারীদের পক্ষ থেকে ৬০০০ থেকে ৭০০০ জন আটক হওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। সেটি আবেদনকারীদের দাবি, তবে রাষ্ট্রের উচিত নিজের হিসাব প্রকাশ করা।
আরেকটি উদ্বেগজনক অভিযোগ করেন ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি। তাঁর বক্তব্য, সকাল প্রায় ৭টায় সাদা পোশাকের প্রায় ২০ জন গুরুগ্রামের বাড়িতে ঢুকে তাঁকে তুলে নিয়ে যান। তিনি আরও বলেছেন, পরোয়ানা দেখানো হয়নি এবং কোনো আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি। পুলিশ বলছে, অফিসাররা তাঁর বাড়িতে গিয়ে দিল্লি না যেতে বলেছিলেন। কোন বিবরণ সত্য, তা এখনও প্রমাণিত নয়। কিন্তু একজন নাগরিককে প্রতিবাদে যোগ দেওয়ার আগেই বাড়ি থেকে তুলে নেবার ঘটনা – সেটি আইনি পদ্ধতির দিকে তীব্র প্রশ্ন। নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া এর নিষ্পত্তি হয় না।
১১ অক্টোবর রবিবার, সুপ্রিম কোর্ট বিশেষ বৈঠকে বসে। এই বৈঠক পরিস্থিতির গুরুত্বের প্রমাণ। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, আইনসম্মত পদ্ধতি ছাড়া কাউকে আটক করা যাবে না, বিশেষ করে শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র জমায়েতের ক্ষেত্রে। সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে ১৬৩ ধারার বোর্ড নামাতে হবে, মেট্রো-রেল স্বাভাবিক চলবে, ব্যারিকেড পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং ইন্টারনেট অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে আদালত মনে করিয়েছে, এই নির্দেশ জনশৃঙ্খলার প্রয়োজনে সংবিধানের ১৯(২) অনুচ্ছেদের সীমার অধীন। রাষ্ট্রের পক্ষের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। সলিসিটর জেনারেল জানিয়েছেন, ৩০৩টি মেট্রো স্টেশনের মধ্যে ৪৭টি বন্ধ বা সীমিত থাকলেও ট্রেন সূচি অনুযায়ী চলেছে। পুলিশকর্মীরাও আক্রান্ত হয়েছেন বলে আদালতে বলা হয়েছে। সংঘর্ষে কেউ আহত হলে পুলিশের মতো সাধারণ নাগরিকেরও নিরাপত্তা সমান গুরুত্বের।
তাহলে মূল প্রশ্ন কী?
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা পুলিশের বৈধ দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের পদ্ধতিরও আইনি সীমা আছে। হাজার হাজার মানুষকে আটক করা, শহরের গণপরিবহন সীমিত করা, ইন্টারনেট ব্যাহত করা এবং আইনজীবীদের কাজে বাধা দেওয়া, এই সবই অনুপাতবোধের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। আদালতে প্রবীণ আইনজীবী শাদান ফারাসত বলেছেন, আটকের পর তাঁকে চলন্ত বাসে তুলে দেওয়া হয়েছিল। একজন আইনজীবীর সঙ্গে এমন আচরণ হলে সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে কী হতে পারে, সেই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই ওঠে। প্রশাসনিক পদক্ষেপের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল কি না, সে প্রশ্নের জবাব দিতে প্রমাণ ও সরকারি ব্যাখ্যা দুটিই যাচাই করতে হবে। অনুমান দিয়ে সেই বিচার হয় না।
কোথায় প্রশ্ন, কোথায় প্রমাণ
প্রতিবাদকারীদের দাবির পেছনেও বাস্তব প্রশ্ন আছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধান অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার লিখিতভাবে কমিশনের সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ফর্ম ৬-এ যোগ হওয়া একটি নতুন ঘোষণা। কমিশনারদের একজনের যুক্তি, আইন-সংশোধন ছাড়া বিধিবদ্ধ ফর্ম বদলানো যায় না। কমিশনের জবাব, মতভেদ সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ, সব সিদ্ধান্ত তিনজনের অনুমোদনেই হয়েছে, এবং ফর্ম নিজে বদলানো হয়নি, একটি অতিরিক্ত ঘোষণা যোগ হয়েছে মাত্র।
বিষয়টি এখন সুপ্রিম কোর্টে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ ৫ অক্টোবর স্পষ্ট করেছে, ফর্ম ৬-এর কোনও পরিবর্তিত রূপ আদালত অনুমোদন করেনি। কমিশন ২৬ সেপ্টেম্বরের বিবৃতিতে বলেছিল, সুপ্রিম কোর্ট ওই ঘোষণা বহাল রেখেছে। এই দুটি বক্তব্যের পার্থক্য এখনও ব্যাখ্যা-সাপেক্ষ। আদালত কমিশনের কাছে নথি চেয়েছে। তবে সিইসি-কে সাময়িক বরখাস্ত করার আবেদন আদালত মঞ্জুর করেনি, এবং কোনও আদালত এখনও কাউকে দোষী সাব্যস্ত করেনি।
এখানে একটি পার্থক্য স্পষ্ট রাখা জরুরি। মতভেদ থাকলেই সিদ্ধান্ত বেআইনি হয়ে যায় না। নির্ণায়ক প্রশ্ন, সিদ্ধান্তটি আইনসম্মত কর্তৃত্ব, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিয়ম মেনে নেওয়া হয়েছিল কি না। অভিযোগগুলি যেহেতু ভোটাধিকার ও নির্বাচনী স্বচ্ছতার সঙ্গে জড়িত, তার নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য নিষ্পত্তি জরুরি। নির্বাচন পরিচালনার সাংবিধানিক দায়িত্বে থাকা সংস্থার নিরপেক্ষতা প্রমাণের দায় সংস্থার নিজেরই। কোনও রাজনৈতিক দল কমিশনের পক্ষে বা বিপক্ষে দাঁড়ালে তার জবাব কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যাই হওয়া উচিত।
প্রতিবাদের সাফল্য কীসে মাপা হবে
কোনও প্রতিবাদ থামানোর চেষ্টা যদি মূল দাবির চেয়ে বেশি মনোযোগ টানে, তাহলে প্রশাসনের প্রতিক্রিয়াই আন্দোলনের রাজনৈতিক বার্তার অংশ হয়ে যেতে পারে। তবু আন্দোলনের প্রকৃত সাফল্য আটক হওয়ার ঘটনা বা প্রচারে মাপা যায় না। তা মাপা হবে দাবিগুলির যৌক্তিকতা, জনসমর্থন, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক প্রভাবে।
এরকম আরও লেখা পড়তে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হন
শেষ কথা
গণতন্ত্রে প্রতিবাদ কোনও সরকারের সৌজন্যে মেলে না, এটি সংবিধানের স্বীকৃত অধিকার। সরকারের উচিত আদালতের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মানা, আটকের হিসাব প্রকাশ করা, এবং রাঠিসহ প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা। কমিশনেরও উচিত নথি ও ব্যাখ্যা দিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রমাণ করা। মঙ্গলবারের মধ্যে আদালতে নির্দেশ-পালনের রিপোর্ট জমা পড়ার কথা।
প্রশ্নটা তাই শুধু CJP, কোনও রাজনৈতিক দল বা জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে নয়। ভারতের নির্বাচনী গণতন্ত্রে ভোটারের অধিকার কতটা সুরক্ষিত, নির্বাচন কমিশন কতটা স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক, এবং সরকারের সমালোচনা করার অধিকার নাগরিকেরা বাস্তবে কতটা ভোগ করেন, এগুলিই আসল প্রশ্ন। প্রতিবাদের পরীক্ষা শুধু রাষ্ট্রর কাছে প্রশ্ন তোলা নয়, সেই প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রকে কতটা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা গেল, সেটাও। আর রাষ্ট্রের পরীক্ষা হল, সে সমালোচনাকে বাধা মনে করবে, না গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করবে।

